দেশবাসী একটি সমতাভিত্তিক অগ্রসরমান বাজেট চায় : রাশেদ খান মেনন

বৃহস্পতিবার, জুন ১১, ২০২০,১:৩৪ অপরাহ্ণ
0
52

[ + ফন্ট সাইজ বড় করুন ] /[ - ফন্ট সাইজ ছোট করুন ]

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনেই বাজেট পেশ করবেন। দেশসহ সারা বিশ্ব করোনাকাল অতিক্রম করছে। এর শেষ হওয়া নিয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। সুতরাং এই করোনাকালে কোন ভবিষ্যত পরিকল্পনাও দুরূহ, যদিও সেটা এক বছরের জন্যও হয়। এ কারণেই অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে বলেছেন এটা হবে আপৎকালীন বাজেট। উন্নয়নের যে গতিধারার মধ্যে ছিলাম তা যাতে অব্যাহত থাকে সেই লক্ষ্যকেই সামনে রেখে বাজেট প্রণীত হবে সেটাই স্বাভাবিক। এখানে জীবন ও জীবিকার প্রশ্নটি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে। সুতরাং বাজেটের অগ্রাধিকার নিরুপনের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে বলেছেন সরকার সেই লক্ষ্যে যে প্রণোদনাগুলো দিয়েছেন তাকে সমন্বিত করেই বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করা হবে।

করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে যে বিষয়গুলো দেখিয়ে দিয়েছে তা’হল আমরা যে অর্থনৈতিক নীতি, অর্থাৎ বাজারঘনিষ্ঠ উদারনৈতিক অর্থনৈতিক নীতি তা আমাদের দেশে কেবল নয়, বিশ্বেই প্রাসঙ্গিক হয়ে পরেছে। বিশ্ব ব্যবস্থাকে এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে কোন পথে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ঘটিয়ে সামনে এগুনো যাবে।

আমরা যদি আমাদের স্বাস্থ্য খাতকেই দেখি আমরা এই খাতকে বাজেটের উপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। যদিও আমাদের রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা আছে, সেখানে এই উভয় খাতকেই আমরা বেসরকারি ব্যবস্থাপনার উপর ছেড়ে রেখেছি। এর ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছি যে যখন করোনা তার ভয়াল রূপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে তখন এই ব্যক্তিখাতের চিকিৎসা ব্যবস্থা পিছে সরে গেছে। তারা এমনকি সাধারণ রোগী নিতে রাজী হয়নি। এখন সরকার কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে কোভিড-১৯ রোগী নিতে রাজী হলেও তার উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে। এমনকি উচ্চ মধ্যবিত্তেরও। এখন বাধ্যতামূলক করায় মাস্ক, পিপিই সামগ্রী, অক্সিমিটার অক্সিমেট সিলিন্ডারের দাম চড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে।

এই পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন রক্ষায় তার চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য বাজেট যদি স্বাস্থ্যখাতকে অগ্রাধিকার না দেয়, সেটা কেবল অবিবেচনাপ্রসূতই হবে না, এটা ঘরে নিতে রাষ্ট্র জনগণের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিতে রাজী নয়। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যবীমা ও সার্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কথা এসে যায়। এ নিয়ে বেশ কয়েক বছর আলোচনা হলেও কোন অগ্রগতি নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমিউনিটি হাসপাতালের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকে মানুষের দোর গোড়ায় নিয়ে গেছেন। তার উপর একটু বিশেষাষিত চিকিৎসা হলেই সেটা জনগণের টাকায় কিনতে হবে এবং এর পরিমাণ শতকরা ৭২ ভাগ। সরকারের অংশ মাত্র ২৮ ভাগ। করোনা পরিস্থিতি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই অসঙ্গতিকেই বিশেষভাবে তুলে ধরছে।

দ্বিতীয় যে বাজেটে অগ্রাধিকারের বিষয় আসছে তা’হল সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে বাজেটে সংস্থান। এখানে যে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে, অর্থাৎ এই অর্থ সংস্থানের ৩৫% ভাগ যেখানে সরকারি কর্মচারিদের পেনশনে যায় তখন এর যে পরিমাণ দেখান হয় তাতে সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি যথাযথভাবে নিশ্চিত করা যায় না। এবার করোনাকালে দারিদ্র্যসীমার নিচে যে মানুষ অর্থাৎ শতকরা ২১ ভাগ, তার সাথে আরও ২১ ভাগ যুক্ত হবে বলে অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন। এই দরিদ্র ও হতদরিদ্রের জন্য সামাজিক সুরক্ষার পরিসর অনেক বিস্তৃত করতে হবে। ইতিমধ্যে সরকার সামাজিক সুরক্ষার লক্ষ্যে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ ও পঞ্চাশ লাখ পরিবারের জন্য ২৫০০ টাকা প্রণোদনা দিয়েছেন। বাজেটে নিশ্চয়ই একে সমন্বিত করা হবে। কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া ঠেকাতে এটা যে যথেষ্ট নয়, সেটা সাধারণ যে কেউ অনুধাবন করতে পারে। বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে এক হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে তা নিয়ে বড় গলা করা ঠিক হবে না। অত্যন্ত সচেতনভাবেই এ খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

তৃতীয় প্রশ্ন আসছে কর্মসংস্থান। করোনার প্রভাবে বিশাল সংখ্যক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। গার্মেন্টস মালিকরা জুন মাসেই আরো অধিক সংখ্যককে ছাটাই করবে বলে বলেছে। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য তার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণায় এ কথাটি মাথায় রেখে শ্রমিকদের বেতন দেয়ার জন্য ২.৫০% সুদে ঋণ ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। যারা পূর্বে ঋণ নিয়েছিল তিন মাসের জন্য তাদের সুদারোপ স্থগিত করে দিয়েছেন, ঋণ খেলাপীর বিষয়েও শর্ত শিথিল করেছেন তারপরও গার্মেন্টস মালিকদের এই কথা সরকারকে কলা দেখানোর সামিল।
বাজেট কৌশলে এই কর্মহীনতা রোধ করে কিভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা যায় অর্থমন্ত্রী সে পথ দেখাবেন বলে আশা করা অসমিচীন হবে না।

করোনাকালে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা কেবল শিক্ষা-সময়ই হারাচ্ছে না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও অকার্যকর হয়ে পরছে। এর উত্তর হচ্ছে অন-লাইন শিক্ষা। ডিজিটাল বাংলাদেশে এটা কোন অসম্ভব প্রস্তাব নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এটা করলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সে পথে হাটছে না। বড় কারণ তাদের শিক্ষার্থীদের পক্ষে ল্যাপটপের ব্যবস্থা করা, ইন্টারনেট খরচ যোগান সম্ভব নয়। এর ফলে যেটা হচ্ছে তা’হল ডিজিটাল ডিভাইড। সামর্থ্যবানরাই কেবল অন-লাইনে টিকে থাকবে, অন্যরা নয়। এর উত্তর বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বহুগুণ বাড়িয়ে তাকে ডিজিটাল শিক্ষা উপযোগী করা। এছাড়া রয়েছে গবেষণা খাতে বরাদ্দের প্রশ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবগুলো কোভিড শনাক্তকরণের কাজ করতে পারত, যেভাবে অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করোনা মোকাবিলায় সরকারের সহায়তায় নেমেছে। এখানে কেবল অর্থ বরাদ্দের অভাব এই সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ল্যাবগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
পঞ্চমতঃ করোনাকালে যার উপর আমাদের দাড়াতে হবে তা’হল কৃষি, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করবে। এই কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ বা উপযুক্ত বীজ-সার সরবরাহ নিশ্চিত করলেই হবে না, এর জন্য যে পুঁজি প্রয়োজন হবে বাজেটকে তা সরবরাহ করতে হবে। এবং সেটা ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভবন করে নয়, সমবায় পদ্ধতি বা সমষ্টিগত মালিকানার ধারণাকে উৎসাহিত করে কৃষিকে এই সময়কালে অগ্রসরমান করে নিতে হবে।

আর এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আসবে কর সংগ্রহের মধ্য দিয়ে। দরিদ্র ও নিম্ন বিত্তকে কর ছাড় দিয়ে কর সংগ্রহই করতে হবে সম্পদের উপর থেকে, ব্যবসায় লাভের উপর থেকে। কর ব্যবস্থার যে সংস্কার বিত্তবানদের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে আজ পর্যন্ত হয় নাই, বাজেটে সেই কর ব্যবস্থা সংস্কারের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকতে হবে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি সমতা ভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। সংবিধানেও তার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। করোনা যেখানে উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, ধনী দেশ দরিদ্র দেশকে এক কাতারে দাড় করিয়েছে, তার উপর ভিত্তি করেই একটি সমতাভিত্তিক অগ্রসরমান বাজেটই প্রত্যাশা করে দেশবাসী।

বিঃদ্রঃ মানব সংবাদ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে