শিশুর ভৌত পরিবেশে স্থাপিত হোক বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি

শুক্রবার, এপ্রিল ৩, ২০২০,৩:৫৫ অপরাহ্ণ
0
79

[ + ফন্ট সাইজ বড় করুন ] /[ - ফন্ট সাইজ ছোট করুন ]

জন্মের পর থেকে শিশু একা থাকে না বরং সে কোন না কোন পরিবার বা গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত হয়ে তাদেরসাথে সক্রিয় মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে বেড়ে ওঠে। সে জন্য শিশুর ভৌত পরিবেশ শিক্ষার সহায়ক হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় শিশু নিজের মতো করে একটা কিছু গ্রহণ করবে, যা আমরা আদৌ প্রত্যাশা করি না। শিশুর ভৌত পরিবেশ বলতে যে পরিবেশে শিশু বড় হয়ে ওঠে। বাড়িঘরের আশপাশ থেকে বিদ্যালয় পর্যন্ত -যেখানে শিশু প্রতিনিয়ত ঘোরাফেরা করে। মনোবিজ্ঞানী ভাইগ্টস্কির মতে, শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ সর্বাংশেই সমাজ ও সংস্কৃতির পটভূমি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

শৈশব থেকে মানবশিশু তার চারপাশে যা দেখে বা অনুভব করে তার একটা নিখুঁত চিত্র মনের মধ্যে আঁকতে শুরু করে; যা তার জীবনের জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা হিসেবে স্থায়ী রূপ লাভ করে। শিশুকে আদর্শ দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে ভৌত পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম। এ প্রসংগে ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ জ্যাক রুশো’র অভিমত তুলে ধরা যেতে পারে। রুশো শিশুকে প্রকৃতি থেকে অভিজ্ঞতা অর্জনের কথা বলেছেন। শিশুকে প্রকৃতির মাঝে ছেড়ে দিতে হবে, যাতে সে দেখে, ভুগে ও ঠেকে শিখতে পারে। একই কথা বলেছেন দার্শনিক ফেডারিক হারবার্ট, শিশু তার পারিপার্শ্বিকতা থেকে বস্তু ও ঘটনা সম্পর্কে ধারনা পায়, তা যদি তার মনঃপুত হয়, তবেই শিশুর শিক্ষা সফল হবে।

আমরা লক্ষ্য করছি যে, বস্তি পরিবেশে যে সব শিশু বেড়ে ওঠে তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেশি জন্ম নেয়। নিশ্চয় জ্যাক রুশো এমন পরিবেশে শিশুকে ছেড়ে দিতে বলেন নি। শিশুকে যদি পরিবেশ-প্রকৃতির কাছ থেকেকিছুটা হলেও শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়, তাহলে সেই পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত, একটু ভেবে নিলেই হয়।

আমি দেশের জন্য কেমন নাগরিক চাই? যদি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নাগরিক চাই, তাহলে শিশুর ভৌত পরিবেশে সেসবের উপস্থিতি প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসার জন্য প্রয়োজন শিশুর দেশপ্রেমের শিক্ষা। বঙ্গবন্ধু বিশ্বজুড়ে দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শিশুর হৃদয়-মনে যখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আলো ছড়াবে -তখই সেই শিশু হয়ে ওঠবে একদিন সোনার বাংলার সোনার মানুষ। বঙ্গবন্ধু তার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে যাদের উপস্থিতি আশা করেছিলেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর বঙ্গবন্ধুকে জানি শিরোনামে দেশব্যাপি প্রতিবছর এক ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে। এটা কতদূর সুফল বয়ে আনতে পারে তা বলা মুস্কিল। তবে প্রতিয়োগিতা দিয়ে আদর্শ তৈরি হয় না। বরং জিতে গিয়ে পুরস্কার অর্জন করা যায়;জ্ঞান অর্জন করা যায়। শিক্ষাকে মনের বিষয় করে গড়ে তুলতে না পারলে তা ব্যর্থ হয়। জ্ঞানার্জনেই যে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য নয়, সেকথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেক পূর্বেই বলে গেছেন। যারা একটার পর একটা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাশ করে দেশের বড় বড় অফিস আদালতের বড় বড় কর্তা হয়ে বসে আছেন, তাদের বড় বড় দুর্নীতির খবর বড়বেশি অজানা নেই। সুতরাং শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করাটা কারো মতেই শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে পারে না। আমাদের বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি ছেলেদের মূল্যবোধের শিক্ষা, ব্যক্তিত্বের শিক্ষা সর্বপরি মহৎ হবার শিক্ষা দেয় না। কেবল জ্ঞানার্জন করে জ্ঞানী হবার শিক্ষা দেয়।

শিশু তার ভৌত পরিবেশের মধ্যে বাড়ি ও বিদ্যালয় -এ দুটো স্থানে অধিক সময় কাটান। বাড়িতে বা শিশুর ঘরে প্রচুর বই রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রাখা যেতে পারে দেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গের ছবিসহ কিছু শিল্পকর্মের নমুনা। বইবিহীন ঘর মানে তো প্রাণহীন দেহ। যার বাড়িতে যত বেশি বই আছে, মনের দিক থেকে সে তত বেশি ধনী। অন্যদিকে বিদ্যালয়ে থাকবে শত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘকায় প্রতিকৃতি। চারদেয়ালে বীরশ্রেষ্ঠসহ মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যাবলি। আর যে পথ ধরে শিশু বিদ্যালয়ে আসবে, সে পথের নাম হবে স্থানীয় কোন শহিদ বীরমুক্তিযোদ্ধার নামে। এ পথে চলতে চলতে শিশুটি বঙ্গবন্ধুকে জানবে, মুক্তিযুদ্ধ ও তার স্বদেশকে চিনবে।

আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছি। শিশুর বিদ্যালয়টি ঐ দিন বন্ধ রেখে আমরা শিশুকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছি। যদি শিশুর বিদ্যালয়ে একটি বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি থাকতো, যদি শিশুর বাড়িতে নিজ হাতে লাগানো একটি ফুলের গাছ থাকতো, যদি শিশুটি সে গাছে একটা ফুল ফোটার অপেক্ষায় থাকতো, যদি জাতীয় শিশু দিবসে সেই ফুলটা ছিড়ে নিয়ে বিদ্যালয়ে চলে আসতো। যদি বন্ধুদের সাথে সবাই হাতের ফুলগুলো দিতো পিতার প্রতিকৃতিতে। …একটু ভেবে দেখুন তো, তাহলে কেমন হতো?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কথা আছে, ছেলে মানুষ করিতে হইলে ছেলেবেলা হইতেই মানুষ করিতে হইবে, নতুবা সে ছেলেই থাকিবে মানুষ হইবে না। বঙ্গবন্ধু সেটা করতেই সে সময়ে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একঘোষণায় জাতীয়করণ করেছেন। একই কাজ করলেন বঙ্গনন্দিনী। এ স্তরের শিক্ষকের মর্যাদাও অনেক বৃদ্ধি করা হয়েছে। নির্মিত হচ্ছে সুন্দর সুন্দর বিদ্যালয় ভবন।এখন শুধু চাই বিদ্যালয়গুলোতে বঙ্গবন্ধুর একটা প্রতিকৃতি। এটা কি খুব বেশি চাওয়া হয়ে গেল?

লেখক : তৌহিদ-উল ইসলাম, শিক্ষক, গীতিকার ও শিশুসাহিত্যিক।

বিঃদ্রঃ মানব সংবাদ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে