ভাষা আন্দোলনে ও একুশের চেতনায় বঙ্গবন্ধু

রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১,১২:০৫ অপরাহ্ণ
0
49

[ + ফন্ট সাইজ বড় করুন ] /[ - ফন্ট সাইজ ছোট করুন ]

শেখ মোঃ মুজাহিদ নোমানী

বর্ষ পরিক্রমায় যুগের কঠিন কালো পথ ধরে ৬৯ বছর পর আবার ঘুরে এসেছে সেই বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারি। সেই রক্ত রাঙা একুশ। বাংলার আকাশ বাতাস আজ আবার মুখরিত হলো সেই অমর একুশের শুভাগমনী সুরে। এই সেই অবিস্মরণীয় ইতিহাসখ্যাত এক দিবস, যে দিবসে মায়ের ভাষাকে তাঁর যোগ্য আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে যেয়ে আজ থেকে ৬৯ বছর পূর্বে এমনি এক সোনালী দিনের প্রভাতি পাখির কলকাকলি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল বাংলার শত-শত নর-নারীর আহত করুণ আর্তনাদে। সবুজ কচি ঘাসের উপর পতিত ভোরের শিশিরের শুভ্র বুক রঞ্জিত হয়েছিল মায়ের কোল থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রাণপ্রিয় পুত্রের বুকের তাজা রক্তে। বাংলার ভূতল কেঁপে উঠেছিল শত-শত মা,ভাই-বোনদের লৌহ কঠিন জীবন-মরণ শপথের সিংহ গর্জনে। তাই বাঙালী জাতীয়তাবাদ উন্মেষের ইতিহাসে ২১শে একটি সংগ্রামী শপথ, একটি বিরাট প্রাণসত্ত্বার চেতনা। আর এজন্যই ২১শে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে একটি জয়-জয়ন্তীর উৎসব। ১৯৫২ সালের রক্ত শপথের এই দিনটি ছিল আমাদের বিপ্লবী চেতনার এক প্রচণ্ড বহিঃপ্রকাশ, এক বিপ্লবী মহামন্ত্র, আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার প্রতিষ্ঠার মহা সংকেত।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন মূলত একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হলেও সেটা ছিল বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক আন্দোলনের উৎস। আর সেই সংগ্রামের উৎস ধরে ১৯টি বছরের রক্তের পিচ্ছিল পথ পেরিয়ে ১৯৭১ সালে তার সমাপ্তিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এক স্বাধীন, সার্বভৌম নবীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বাঙালী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশে। স্বার্থক হলো একুশে ফেব্রুয়ারির স্বপ্ন।

একুশে ফেব্রুয়ারির স্বপ্ন বাস্তবায়নে তৎকালীন পাকিস্তানি ও কিছু মীর জাফর বাঙালির বেঈমানের ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে বাঙালির মায়ের ভাষাকে তাঁর যোগ্য আসনে বসিয়ে দেয়ার মহান বাংলা ভাষা আন্দোলনে সম্মুখের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সর্ব প্রথম কারাবরণ করে নিয়েছিলেন যিনি তিনি হচ্ছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, স্বাধীনতার মহান স্থপতি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যা আজকের প্রজন্মের অনেকেরই জানা নেই। অধিকাংশের ধারণা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ রফিক, শফিক, বরকত, সালাম, জব্বার, শফিউর প্রভৃতি নাম না জানা শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই আন্দোলনের সফলতা। কিন্তু এই সফলতা একদিনে আসেনি। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে কুমিল্লার বাঙালি প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ইংরেজি ও উর্দুর সাথে বাংলাকে পরিষদের ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সংশোধনী প্রস্তাব করলে মুসলিম লীগের নেতাদের বিরোধিতায় তা বাতিল হয়ে যায়। এরই প্রেক্ষিতে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ তারিখের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ভাষার দাবিতে ৭ মার্চ ঢাকায় ও ১১ মার্চ দেশের সর্বত্র ধর্মঘট পালন করা হবে।

তীব্র আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল ১৯৪৮-এর ১১ মার্চ। এদিন ছাত্রলীগের নেতৃত্বে গঠিত “সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ” কর্তৃক ‘বাংলা ভাষা দিবস’ ঘোষণার পাশাপাশি এইদিনে পরিষদের ডাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। এটাই ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ দেশে প্রথম সফল হরতাল।

এই হরতালে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সুদূর গোপালগঞ্জ হতে ১০ মার্চ ঢাকায় আসেন, নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে গ্রেফতার হন। উল্লেখ্য ১৯৪৮-এর ১১ মার্চের আন্দোলনে সেদিন ২০০ জন ভাষাপ্রেমী গুরুতরভাবে আহত হন এবং বঙ্গবন্ধুসহ গ্রেফতার হন ৬৯ ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। বন্দীদের মধ্যে কয়েকজন কিশোরও ছিল যা বঙ্গবন্ধু তাঁর ” অসমাপ্ত আত্মজীবনী”-তে উল্লেখ করেছেন।

আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮-এর ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে ০৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে জেলখানায় আটক ভাষা আন্দোলনের কর্মী-রাজবন্দিদের দেখার জন্য চুক্তিপত্রটি পাঠালে বঙ্গবন্ধু চুক্তির শর্তগুলো দেখেন এবং অনুমোদন প্রদান করেন। এই ঐতিহাসিক চুক্তির ফলে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল এবং চুক্তির শর্ত মোতাবেক অন্য ভাষা সৈনিকসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় কারামুক্ত হন। যদিও পরবর্তীতে অন্যন্যা দফাগুলো আর বাস্তবায়ন করা হয় নি।
ভাষাসৈনিক অলি আহাদ তাঁর ‘জাতীয় রাজনীতি ১৪৫ থেকে ১৯৭৫’ গ্রন্থে বলেন, ‘১১ মার্চের হরতাল কর্মসূচিতে যুবক শেখ মুজিব এতটাই উৎসাহিত হয়েছিলেন যে, এ হরতাল ও কর্মসূচি তাঁর জীবনের গতিধারা নতুনভাবে প্রবাহিত করে’। মোনায়েম সরকার সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানঃ জীবন ও রাজনীতি’ শীর্ষক গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘ স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে এটিই তাঁর প্রথম গ্রেফতার।’

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ঐতিহাসিক ১১ মার্চের গুরুত্ব এবং গ্রেফতার প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেন,’ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নয়, মূলত শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ (সূত্রঃ দৈনিক আজাদ, ১৬ ফেব্রুয়ারি,১৯৭১)। ‘পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিলে নেতৃত্বদানের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পুনরায় গ্রেফতার এবং মুক্ত হন ‘ ৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। ফলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিস্ফোরণ পর্বে বঙ্গবন্ধু জেলে ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই ‘৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। ব্যক্তিগতভাবে আন্দোলনে অনুপস্থিত থাকলেও জেলে থেকেই আন্দোলনের নেতাদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন।'(সূত্র : ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা, গাজীউল হক)।

সুতরাং ঐতিহাসিক বাংলা ভাষার আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু উদ্বুদ্ধ হয়ে যথাযথ নেতৃত্ব প্রদান করেছেন, পুলিশি নির্যাতন সহ্য করে কারাবরণ করতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে। শুধু তাইনয় ‘৫২ -এর ভাষা আন্দোলনের বিস্ফোরণ মুহূর্তে জেলে বসে অনশন ধর্মঘট করে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে প্রায় মৃত্যুপথ যাত্রী হয়েছিলেন যা বাংলা ভাষার আন্দোলনকে করেছিল বেগবান। দাবানলের মত ছড়িয়ে পরেছিল তীব্র আন্দোলন ঢাকা হতে দেশের অন্যান্য জেলাসমুহে যার শুরুটা হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সংগ্রাম পরিষদের ডাকা হরতাল ও বঙ্গবন্ধুসহ ভাষাসৈনিকদেরকে গ্রেফতারের মধ্যে দিয়ে।

আর তাই বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জানার জন্য ‘২১ শে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর এই গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরা দরকার কথা ও লেখার মাধ্যমে। ‘৫২ -র এই ২১ ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রছাত্রী- জনতার সম্মিলিত গণজাগরণে পাকিস্তানের মুসলিম লীগের শাসকদের ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে সালাম, বরকত,জব্বার, রফিক, শফিকসহ নাম না জানা আরও অনেক বীরের আত্মাহুতিতে বাংলা ভাষা তখন রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে যার বিস্তারিত বিবরণ বা বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা আত্মজীবনীতে যা তার শাহাদাত বরণের পরে ২২০০৭ সালে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর” অসমাপ্ত আত্মজীবনী” শীর্ষক বইটির ৯৮,১৯৬-২০৭ এবং ২২৮ নং পাতায়। বাংলা ভাষার প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা ছিল বলেই জেলে বন্দী থেকেও বঙ্গবন্ধু পালন করেছেন দুঃসাহসিক ভূমিকা। এক জেল থেকে অন্য জেলে স্থানান্তরের সময়ে, হাসপাতালে বন্দি হিসেবে চিকিৎসা গ্রহণের সময়েও ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে গোপন বৈঠক করেছেন, দিয়েছেন প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।

একুশের চেতনায় বঙ্গবন্ধু : ১৯৪৯ সালে কারাররুদ্ধ হওয়ার ২৭-২৮ মাস পর ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মুক্তিলাভ করেন। মুক্তিলাভের পরপরই ২৭ এপ্রিল ১৯৫২ তারিখে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের জেলা ও মহুকুমা প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাছাড়া ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবসে যে কর্মসূচি নেওয়া হয় তা পালনের জন্য নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সম্পাদক শেখ মুজিব। ঐদিন সকাল থেকে তিনি সাইকেলে করে গোটা ঢাকা শহরে টহল দিয়ে বেড়ান এবং মিছিলের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। পরে আরমানিটোলা ময়দানে লক্ষাধিক লোকের সভায় শেখ মুজিব বক্তৃতা দেন। তাঁর অনুরোধে গাজীউল হক নিজের লেখা প্রথম গানটি ‘ভুলবো না…’ পরিবেশন করেন।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের বিস্ফোরণের পর এর চেতনাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের একজন মন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সমকালীন রাজনীতি এবং বাংলা ভাষার উন্নয়নে অবদান রাখেন। পরবর্তীকালেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষা ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের অধিকারের সেই একই দাবি ও কথাগুলো ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে সফল নেতৃত্ব প্রদানের স্বীকৃতিসহ বাংলা ভাষার আন্দোলনসহ পরবর্তী সকল আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় ভাষার মাসে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসমাবেশে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক তাঁকে “বঙ্গবন্ধু ” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এরপর ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে প্রিয় বাংলা ভাষায় আরো বর্ধিত উচ্চারণে জাতির সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হন।

১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু বাংলা একাডেমিতে একটি সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেন, ‘ ভাষা-আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমি ঘোষণা করছি,’আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই সকল সরকারি অফিস-আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু হবে’(সূত্র : দৈনিক পাকিস্তান, ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১)। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন। এটাই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বাংলা ভাষায় প্রণীত সংবিধান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মূল নায়ক ও স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন,’বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভাষা আন্দোলনেরই সূদুর প্রসারী ফলশ্রুতি ‘(দৈনিক সংবাদ, ২১ ফেব্রুয়ারি,১৯৭৫)
মহান ভাষা আন্দোলনের ফলে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা পায়। মুলত বাঙালির নবজাগরণে তমুদ্দিন মজলিস, ছাত্রলীগ, প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চমকে দেওয়া বিপ্লবী নাম। বাংলা ভাষা আন্দোলনে তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা অস্বীকার করলে অকৃতজ্ঞতা হবে।তাই আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি তাঁদেরকেও একুশে পদকসহ বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা একান্ত প্রয়োজন।আর সেই সাথে এ আন্দোলনে বাঙালি ভাষাপ্রেমিক অংশগ্রহণকারীদের আমরা চিরকাল স্বরণ করবো বিনম্র শ্রদ্ধায় ও আমাদের কাজেকর্মে। তাঁদের পথ ধরেই আমরা স্বাধীনতা আনতে পেরেছি। সফল হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারির স্বপ্ন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমৃত্যু বাংলা ভাষার একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে বাংলা ভাষার উন্নয়ন বিকাশে ও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের সফল, সার্থক ও যোগ্য নেতা ছিলেন বলেই ভাষা সমস্যার সমাধানের ভার তাঁর উপর অর্পিত হয়েছিল। এই মহান নেতা বিশ্ব দরবারে বাংলা ভষার স্বীকৃতি আদায় এবং বাংলা ভাষা ও বাংলাভাষীদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। আর তাই ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে তিনি যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন,তা ইতিহাসের পাতায় চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বিশ্বসভায় বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এটাই ছিল প্রথম সফল উদ্যোগ। (সূত্র : ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু, শামসুজ্জামান শামস)। শুধু তাইনয় ৭ মার্চ’১৯৭১ তারিখে লক্ষ লক্ষ লোকের জনসমুদ্রে রেসকোর্স ময়দানে বাংলা ভাষায় পুরো ১৯ মিনিট ধরে বঙ্গবন্ধু সাবলীল বাংলায় যে অগ্নিঝরা ভাষণ প্রদান করেন তা শুধু ভাষণই ছিল না, ছিল এক মহাকাব্য, ছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষেকে উজ্জীবিত মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে তাঁর সোনার বাংলাকে স্বাধীন করার মূলমন্ত্র।কিছুদিন পরে ৫ এপ্রিল ১৯৭১ সালে Newsweek পত্রিকা বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেক্ষিতে তাঁকে ‘The Poet of Politics’ বলে আখ্যায়িত করে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ৭ই মার্চের ভাষণটি শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়,সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ শুধু ১৯৭১ সালে বাঙালী জাতিকেই অনুপ্রাণিত করেছিল তা নয় বরং এই ভাষণ যুগে যুগে বিশ্বের সকল অবহেলিত ও বঞ্চিত জাতি-গোষ্ঠীকে অনুপ্র্রেরণা জোগাতে থাকবে।আর তাই তো এই ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি সুদীর্ঘ ৪৬ বছর পর ” ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রার”-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা প্রকারন্তে ঐতিহাসিক বাংলা ভাষা ও তার অবদানকে বিশ্বের স্বীকৃতি হিসেবে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং ভারত বাংলাদেশের বাঙালীদেরকে করেছে গর্বিত,আনন্দিত ও উজ্জীবিত।

সুতরাং বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ও বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষাকে অসীম উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পথে বঙ্গবন্ধুর একুশে চেতনা অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে যা তাঁর সাড়ে তিন বছরের রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ, সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা এবং সরকারি সিদ্ধান্তগুলোই তার প্রমাণ বহন করে।

লেখক : বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক প্রাপ্ত কৃষি সাংবাদিক, উদ্ভাবক,বীজ প্রত্যয়ন বিশেষজ্ঞ
এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ। 

বিঃদ্রঃ মানব সংবাদ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে