চা শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্যে মজুরি কাঠামো প্রসঙ্গে

সোমবার, জুলাই ১২, ২০২১,৭:২৯ অপরাহ্ণ
0
11

[ + ফন্ট সাইজ বড় করুন ] /[ - ফন্ট সাইজ ছোট করুন ]

সৈয়দ আমিরুজ্জামান : আমাদের দেশের অর্থনীতিতে চা শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। এর মূল শক্তি চা শ্রমিক-কর্মচারীরা। এদের শ্রমেই এ শিল্পের অট্টালিকা আর অভিজাত জৌলুশ গড়ে উঠেছে। ২০১৭ সালে দেশে মোট চা উৎপাদন হয়েছে ৭৮.৯৫ মিলিয়ন কেজি এবং জিডিপিতে চা শিল্পের মোট অবদান ১৮২৫.২৫ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে চা উৎপাদিত হয়েছে ৯ কোটি ৬০ লাখ ৬৯ হাজার কেজি। চা শিল্পে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে দেশে স্থায়ী ও অস্থায়ী ভিত্তিতে নিবন্ধনকৃত মোট চা বাগানের সংখ্যা হচ্ছে ১৬৪টি – যার মধ্যে মূলধারার চা বাগান রয়েছে ১৫৬টি। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বালিশিরা ভ্যালীর সভাপতি বিজয় হাজরার মতে, ইউনিয়নের যেসব নির্বাচিত পঞ্চায়েত কমিটি রয়েছে, সেই হিসাবে চা বাগানের এ সংখ্যা ২৪১টা। এই প্রথাগত চা বাগানগুলো মূলত মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি জেলাতে অবস্থিত। এ সকল চা বাগানে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৬৪ জন শ্রমিক রয়েছে – যার মধ্যে ২১৯৯৭ জন শ্রমিক অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছে। এই চা বাগানগুলো ব্রিটিশ আমল থেকে তৈরি করা হয়েছে যেখানে শ্রমিকরা স্থায়ীভাবে বাগান কর্তৃপক্ষের দেওয়া বাসস্থানে বসবাস করছে, তাদের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত প্রায় সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাগান কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে সরকারিভাবে বিভিন্ন আইন-কানুন প্রণয়ন ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে যেমন সংবিধান, শ্রমনীতি, ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট এবং আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৮ সালের ও ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহার, বাংলাদেশ শ্রম আইন, শ্রম বিধিমালা ও শ্রমিক-মালিকের দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে বাগান কর্তৃপক্ষ কর্তৃক শ্রমিকদের জন্য বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, রেশন, ভবিষ্য তহবিলসহ বিভিন্ন সুবিধাদি দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে চা শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও অধিকার প্রাপ্তিতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে যার ফলে চা শ্রমিকদের জীবন মানে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এসব পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে চা বাগানগুলোতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও এর উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ, শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি, নলকুপের পানি পান করা শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি, পূর্বের তুলনায় মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ইত্যাদি। চা শ্রমিকদের উন্নয়নে এসব ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন, সভা সেমিনার ও গণ মাধ্যমে এখনও তাদের কর্মপরিবেশ ও অধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। তবে এসব তথ্য পাওয়া গেলেও চা শ্রমিকদের সুস্থ কর্মপরিবেশ ও অধিকার প্রাপ্তিতে শোষণ বৈষম্য এক বড় প্রতিবন্ধকতা। মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন উপযোগী ন্যায্য মজুরী প্রাপ্তিতে যে ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, এর একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণার ঘাটতি রয়েছে।

চা বাগানের শ্রমিকদের সর্বশেষ চুক্তিতে দৈনিক মজুরি মাত্র ১১৭ – ১২০ টাকা ধরা হয়েছে যা দেশের অন্য খাতের শ্রমিকদের তুলনায় কম। চা শ্রমিকদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাসহ হিসাব করলে দেখা যায় মাসিক সর্বোচ্চ ৫২৩১ টাকা যা বাংলাদেশ নিম্নতম মজুরি বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী অন্যান্য খাতের শ্রমিকরা, বিশেষ করে জাহাজ ভাঙ্গা (১৬০০০ টাকা), ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিজ (১২৮০০ টাকা), এ্যালুমিনিয়াম এন্ড এনামেল (৮৭০০ টাকা), ফার্মাসিউটিক্যালস (৮০৫০ টাকা), তৈরি পোশাক (৮০০০ টাকা), টি প্যাকেটিং (৭০৮০ টাকা), স’ মিলস (৬৮৫০ টাকা), অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ (৫৯৩০ টাকা) ও কটন ইন্ডাস্ট্রিজ (৫৭১০ টাকা) এর তুলনায় কম। আবার ক্যাশ প্লাকিং, নিরিখের অতিরিক্ত পাতা তোলা ও অতিরিক্ত কর্মঘন্টার জন্য শ্রম আইন অনুযায়ী মূল মজুরির দ্বিগুণ মজুরি দেওয়ার নিয়ম থাকলেও কোনো বাগানেই তা দেওয়া হয় না, বরং কম দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও ১৬৪টি বাগানের মধ্যে ২৮টি বাগানে অস্থায়ী শ্রমিকদের স্থায়ীদের সমান মজুরি দেওয়া হয় না যা শ্রম আইনের লঙ্ঘন।

চা শিল্পের মালিকগণের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্য ও শ্রমিকগণের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্য কর্তৃক দাখিলকৃত মজুরী প্রস্তাব এবং গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান টিআইবি এর গবেষণা প্রতিবেদন ও বিভিন্ন শ্রমিক/কর্মচারীদের সংগঠনের পক্ষ হতে দাখিলকৃত স্মারকলিপি/মজুরী প্রস্তাবসহ শ্রমিকগণের জীবনযাপন ব্যয়, জীবনযাপনের মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি ও মান, ব্যবসায়িক সামর্থ্য, দেশের এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় পর্যালোচনা করার পর সার্বিক অবস্থা বিবেচনাপূর্বক ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ১৩৯ ধারা ও ২০১৫ সালের শ্রম বিধিমালার ১২৯ বিধি মোতাবেক ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গত ১৩ জুন ২০২১ এক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চা-বাগানের শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্যে খসড়া মজুরি কাঠামো ঘোষণা করেছে। ২০১৯ সালের অক্টোবরে গঠিত হয়েছে মজুরি বোর্ড। চা-বাগানে সাপ্তাহিক ও মাসিক মজুরির ভিত্তিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৬৪ জন শ্রমিক রয়েছে। দৈনিক ভিত্তিতে যারা কাজ করে, তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন উপযোগী ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে নানা মত ও বিতর্ক আছে। আর মাসিক বেতনের ভিত্তিতে প্রায় ৩৫০০ কর্মচারী রয়েছে। চুক্তিনামার মেয়াদ দুই বছর রাখাসহ ২০১৯ সালের প্রাপ্ত বেতন থেকে ২৮.৪৩% বৃদ্ধি করে নিম্নতম বেতন ঘোষণার দাবী জানিয়ে বাংলাদেশ চা বাগান কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মাহবুব রেজা বলেন, “নিম্নতম মজুরী বোর্ড চা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিক কর্মচারীদের মজুরী সংক্রান্ত খসড়া গেজেট প্রকাশ করেছে, তা শ্রমিক কর্মচারীদের স্বার্থের পরিপন্থী ধারা গুলির বিরুদ্ধে আপত্তি এবং কিছু জায়গায় সুপারিশমালাসহ সংশোধিত আকারে প্রকাশ করার জন্য দাবি জানিয়েছি।

১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনের রেজি: নং বি-২৫১। দীর্ঘ ৬৭ বছর যাবত অত্র সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের সাথে দরকষাকষি করে ২ বৎসর পর পর কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করে আসছে, যা অদ্যাবধি বলবৎ। নিম্নতম মজুরী বোর্ড গঠনের পর অত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য বারবার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু মজুরী বোর্ড আমাদের আবেদন আমলে নেননি।

সর্বশেষ বিগত ১৫.১০.২০২০ বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশীয় চা সংসদ মাসিক বেতনধারী চা শ্রমিকদের বেতন ২০১৮ সালের প্রাপ্ত বেতন থেকে ২০১৯-২০২০ মেয়াদের জন্য ২৮.৪৩% বৃদ্ধি করা হয়। সেই আলোকে আমাদের ২০১৯ সালের বেতন কাঠামো থেকে বৃদ্ধি করার আবেদন করি। কিন্তু মজুরী বোর্ড তাও আমলে না নিয়ে চা সংসদের সম্পাদিত ২০১৮-২০১৯ চুক্তিনামার হুবহু বেতন কাঠামো উল্লেখিত গেজেটে প্রকাশ করেছেন। এতে চা বাগান কর্মচারীরা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন। এছাড়াও দীর্ঘদিন যাবৎ মালিকপক্ষের সাথে চুক্তিনামার মেয়াদ ছিল ২ বৎসর, ইহা পরিবর্তন করে চুক্তিনামার মেয়াদ ৩ বছর করা হয়েছে। আমরা মনে করি এই কারণে ভবিষ্যতে চা বাগান কর্মচারীরা ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
আমাদের আরজি মতে চুক্তিনামার মেয়াদ দুই বছর রাখা এবং ২০১৯ সালের প্রাপ্ত বেতন থেকে ২৮.৪৩% বৃদ্ধি করে নিম্নতম বেতন ঘোষণার দাবী জানাই। এবিষয়কে কেন্দ্র করে চা শিল্পে কোনরূপ অসন্তোষ বিরাজ করলে, এর দায়ভার নিম্নতম মজুরী বোর্ডকে বহন করতে হবে।’

মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান (সিনিয়র জেলা জজ) সুলতান মাহমুদ। তিনি চলতি বছরের ২১ এপ্রিল দায়িত্ব নিয়েছেন। এবার মজুরি বোর্ড ‘এ’ শ্রেণির বাগানের জন্যে একজন চা-শ্রমিকের মজুরি ১২০ টাকা নির্ধারণ করেছে। ‘বি’ শ্রেণির বাগানের জন্যে মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৮ টাকা। আর ১১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সি’ শ্রেণির বাগানের জন্যে। অন্যদিকে কর্মচারীদের জন্য ন্যূনতম বেতন ঘোষণা করা হয়েছে চা সংসদের সাথে সম্পাদিত ২০১৮-১৯ সময়কালের চুক্তিনামার হুবহু বেতন কাঠামো অর্থাৎ ১২৭০০ – ২৫৪ × ১৮ – ১৭২৭২ EB ৫১৭ × ১২ – ২৩৪৭৬ স্কেল। মজুরি কাঠামো সংক্রান্ত বিষয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে নারাজ।
একটি বাগানের উৎপাদন ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে সেগুলোর শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত শ্রমিকের মজুরি একই রকম।

ঘোষিত এই খসড়া মজুরি কাঠামো চা শ্রমিক-কর্মচারীদের
বিক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে। কারণ, এখানে মজুরি বৃদ্ধি না করে একতরফাভাবে মালিকপক্ষের স্বার্থে কাজ করেছে বোর্ড। যদিও
মজুরি বোর্ড ঘোষিত মজুরি/বেতন চা শ্রমিক-কর্মচারীরা মালিকপক্ষের সাথে বিগত সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী এখনো পাচ্ছেন। নতুন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে।
২০১৯-২০ সময়ের জন্যে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও চা-বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চুক্তির ওপর ভিত্তি করেই সেই মজুরি তারা এখনো পাচ্ছেন। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন এক লাখ ৩৮ হাজার ৩৬৪ জন শ্রমিকের সংগঠন। এ বাগানগুলো ছড়িয়ে আছে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জায়গায়। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন চা-শ্রমিকদের একমাত্র ট্রেড ইউনিয়ন ও সিবিএ সংগঠন। এর সদর দপ্তর মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল শহরে। এই দপ্তরটি লেবার হাউস নামে পরিচিত। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন ও বিটিএ প্রতি দুই বছর অন্তর মজুরির জন্যে চুক্তি সই করে। আর প্রতিবারই দেখা যায়, চা-শ্রমিকদের মজুরি সামান্য হলেও বাড়ে। ২০১৯-২০ মেয়াদে চুক্তির ফলে এখন চা-শ্রমিকরা যে ১২০ টাকা পাচ্ছেন, তাও এই চুক্তির ফসল। এর আগে ২০১৭-১৮ সালের জন্যে চুক্তি অনুযায়ী একজন শ্রমিক ১০২ টাকা দৈনিক নগদ মজুরি পেতেন।

২০১৯-২০ সালের চুক্তির মেয়াদ ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যায়। প্রথা অনুযায়ী, বিটিএ ও বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন আবার নতুন করে চুক্তি করার কথা ছিল। সেই চুক্তি ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। আর এবার অন্তত আরও ১০০ টাকা মজুরি বাড়াতে পারত। কিন্তু, আশ্চর্যজনকভাবে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড চা শ্রমিক ইউনিয়ন কর্তৃক দাখিলকৃত মজুরী প্রস্তাব এবং গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান টিআইবি এর গবেষণা প্রতিবেদন, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন ও ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস সহ বিভিন্ন শ্রমিক/কর্মচারীদের সংগঠনের পক্ষ হতে দাখিলকৃত স্মারকলিপি/মজুরী প্রস্তাবসহ শ্রমিকগণের জীবনযাপন ব্যয়, জীবনযাপনের মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি ও মান, ব্যবসায়িক সামর্থ্য, দেশের এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা না করেই দুই বছর ছয় মাস আগে শেষ হয়ে যাওয়া বিগত চুক্তিতে থাকা বিদ্যমান মজুরির হারকে বহাল রেখেই নতুন প্রস্তাব করল। যে প্রস্তাবে নতুনত্ব ও মজুরী বৃদ্ধি কোনোটাই ছিলোনা। যা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য না।

গত ১৩ জুন প্রকাশিত গেজেটের দিকে নজর দিলে দেখা যাচ্ছে, সেখানে শ্রমিক ও চা-বাগানের সাড়ে তিন হাজার কর্মচারীর জন্যে মজুরি বোর্ড যে কাঠামো প্রস্তাব করেছে, তা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। তাদের ঘোষিত এই মজুরি কাঠামো চা শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন উপযোগী তো নয়ই, চলনসইও নয়। জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ সহ বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর অনেক গবেষক মনে করেন, মজুরি বোর্ড তার কর্ম পরিধির বাইরে গিয়ে কিছু কিছু জায়গায় শ্রমিক -কর্মচারীদের স্বার্থের প্রশ্নে ন্যায্যতার বিষয়কে প্রাধান্য না দিয়ে মালিকপক্ষের লুটেরা সংস্কৃতি ও শোষণের উদগ্র বাসনাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এখনকার সময়ে ১২০ টাকা মজুরি কতটুকু ন্যায্য? এটা ঠিক যে এই মজুরির বাইরেও একজন চা-শ্রমিক রেশনে স্বল্পমূল্যে চাল বা আটা পান। প্রতি সপ্তাহে একজন চা-শ্রমিক বা তার পরিবারের সদস্য গড়ে সাত থেকে আট কেজি চাল অথবা আটা পায়। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের হিসাব অনুযায়ী, মজুরির পাশাপাশি এসব সুবিধাসমূহ অর্থমূল্যে যোগ করলে একজন চা-শ্রমিক প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২০০ টাকার সমপরিমাণ মজুরি পান। অর্থাৎ মাসে পান ছয় হাজার টাকার সমপরিমাণ। তবে, চা-বাগান মালিকপক্ষ হিসাব দেন এর উল্টো। তারা চা-শ্রমিকদের দেওয়া অন্যান্য সুবিধাকে অর্থের মূল্য বিচার করে একটা হিসাব দেয়। বাংলাদেশ চা-বোর্ডের লেবার, হেলথ ও ওয়েলফেয়ার সাব-কমিটির আহ্বায়ক তাহসিন আহমেদ চৌধুরী গত ২১ মে ২০২১ সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (শেড) আয়োজিত এক সংলাপে বলেন, ‘একজন চা-শ্রমিক সর্বসাকুল্যে ৪০৩ টাকার সমপরিমাণ অর্থ প্রতিদিন পান।’

স্বল্পমূল্যে রেশনের পাশাপাশি চা-বাগান মালিকেরা ঘর ভাড়া, চা-পাতা তোলার বিভিন্ন সরঞ্জাম, অতিরিক্ত সময়ের মজুরি, প্রভিডেন্ট ফান্ডে মালিকদের অনুদান, চিকিৎসা ব্যয়, পেনশন, চা-শ্রমিকদের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্যে ব্যয়, শ্রমিক কল্যাণ কর্মসূচির ব্যয়, এমনকি সরকারের কাছে থেকে চা-বাগানের জন্যে লিজ নেওয়া জায়গায় চা-শ্রমিকরা শাকসবজি, ফলমূলের চাষ কিংবা শ্রমিকদের গরু-বাছুর চড়ানোর যে কাজ করেন, সেগুলোকেও এই ৪০৩ টাকার মধ্যে ধরেছেন। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী বলেন, ‘এই হিসাব উদ্ভট ও অগ্রহণযোগ্য। আমরা এই ধরনের কাল্পনিক হিসাব প্রত্যাখ্যান করি।’

২০০৬ সালের শ্রম আইনের দুই নম্বর ধারার ৪৫ নম্বর উপধারা অনুযায়ী, বাসস্থান, আলো, পানি, চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধা যা কিনা সরকার বিশেষ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দিয়ে থাকেন, সেগুলো শ্রমিকের মজুরির ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। সেই অনুযায়ী, এমনকি পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডে মালিকের অনুদানকেও এর মধ্যে ধরা যাবে না।

চা-বাগানের মালিকেরা যদি শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা মেনে চলেন, তবে শ্রমিকদের মজুরি থেকে এইসব সুবিধার বিষয়গুলোকে বাদ দিতে হবে। আর যদি তা করা হয়, তখন তারা শ্রমিকের দিনপ্রতি মজুরির যে হিসাব দেন, তা চা শ্রমিক ইউনিয়নের দেওয়া হিসাব অর্থাৎ সবমিলিয়ে ২০০ টাকার চেয়ে বেশি হবে না। চা-শ্রমিক ও চা-শিল্পের উন্নতির স্বার্থেই বাগান মালিকদের অনেক বেশি যৌক্তিক হতে হবে তাদের হিসাবের বিষয়ে।

ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের আরও বেশ কিছু সিদ্ধান্ত চা শ্রমিক- কর্মচারীদের বিক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে। যেমন: প্রথাগতভাবে চা শ্রমিক-কর্মচারীদের আলাদা দুই সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মালিকেরা প্রতি দুই বছর পর পর মজুরি বাড়ানোর বিষয়ে আলাদা চুক্তি সই করত। আর তাতে সামান্য পরিমাণে চা শ্রমিক- কর্মচারীদের মজুরি/বেতন বাড়ত। কোনোরূপ যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই ন্যূনতম মজুরি বোর্ড এই মেয়াদ তিন বছর পরপর করার জন্যে প্রস্তাব করেছে। এই প্রস্তাব যদি মেনে নেওয়া হয়, তবে তা খুবই অল্প পরিমাণ মজুরি পাওয়া চা-শ্রমিকদের জন্যে একটা বিরাট ক্ষতির কারণ হবে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পংকজ এ কন্দ বলেন, ‘মজুরি বোর্ডের সুপারিশ বাস্তবতা বিবর্জিত ও অগ্রহণযোগ্য। বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জোর দাবী করছি। ‘
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডে ইউনিয়নের প্রতিনিধি রাম ভজন কৈরি বলেন, ‘মজুরি বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আমরা এর সংশোধন চাই। মজুরির বিষয়ে প্রতি দুই বছর পর পর আলোচনার যে প্রথা আছে, সেটি অবশ্যই রাখতে হবে।’

চা-বাগানে একজন শ্রমিক মারা গেলে বা অবসর নিলে তার পরিবারের একজন সদস্য বা আত্মীয় সরাসরি ওই শূন্য পদে নিয়োগ পান। ন্যূনতম মজুরি বোর্ড এই নিয়োগের বিষয়টি শুধু চা-শ্রমিকের ছেলে বা মেয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। মজুরি কাঠামোতে দুঃখজনকভাবে শ্রমিকের প্রবেশন পিরিয়ডের সময় ছয় মাস পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রবেশন পিরিয়ডে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি হবে ১১০ টাকা এবং মাসিক মজুরি প্রাপ্তদের মজুরি ছয় হাজার টাকা। প্রবেশন পিরিয়ডে থাকা শ্রমিকেরা সফলভাবে তাদের কাজ সম্পন্ন করার পরই গ্রেড অনুযায়ী স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পাবে। চা শ্রমিক ইউনিয়ন মজুরি কাঠামোর এই ধারাটি বাতিলের দাবি করেছে। কারণ, এটি তাদের প্রথা (দস্তুর) বিরোধী। বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালার পঞ্চম তফসিলের নয় নম্বর অধ্যায়ে বলা আছে, চা-বাগানে দীর্ঘদিনের প্রথা এবং সুযোগ-সুবিধা কার্যকর রাখতে হবে। তাই মজুরি কাঠামোতে প্রবেশন পিরিয়ড নিয়ে যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা শ্রম বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ন্যূনতম মজুরি বোর্ড পেনশন ও গ্রাচুইটির বিষয়ে চা-বাগান মালিকদের অবস্থানকে অন্ধভাবে সমর্থন করেছে। চা-শ্রমিকদের সাপ্তাহিক পেনশনের পরিমাণ ২০০৮ সালে ছিল ২০ টাকা এবং ২০২০ সালে এটি ১৫০ টাকা হয়। চা-বাগান মালিকেরা ২০১৭-১৮ সালে চা শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের চুক্তির সময় প্রথমবারের মতো শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের গ্রাচুইটি দিতে রাজি হয়। কিন্তু, চা-শ্রমিকরা এটি আর কখনই পাইনি। মালিকেরা তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। গ্রাচুইটির কথা ভুলে গিয়ে মালিকেরা এখন চলমান পেনশন, অর্থাৎ সপ্তাহে ১৫০ টাকা নিয়ে শ্রমিকদেরকে সন্তুষ্ট থাকতে বলছেন। আর এক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড মালিকদের পক্ষ নিয়েছে। তবে, চা-শ্রমিকরা তাদের গ্রাচুইটি পাওয়ার দাবি থেকে সরে আসেনি।

যতক্ষণ পর্যন্ত পেনশন দেওয়ার বিধান থাকবে, ততক্ষণ মালিকদেরকে শ্রম আইন মেনে চলতে হবে। মালিকরা যে দাবি করেন, অর্থাৎ চা-শ্রমিকদের তারা প্রতিদিন ৪০৩ টাকা করে দেন, তা যদি সত্যি বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে প্রতি মাসে একজন শ্রমিকের পেনশনের পরিমাণ কত দাঁড়ায়? এখন চা-শ্রমিকরা প্রতিদিন যে মজুরি পান, অনেকেই সেটিকে তাদের মূল মজুরি বলে গণ্য করেন। তা যদি ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে একজন অবসর নেওয়া শ্রমিকের প্রতিমাসে পেনশন হিসেবে তিন হাজার ছয় শ টাকা (১২০ টাকা করে ৩০ দিন হিসাবে) পাওয়া উচিত এবং তা কখনই ছয় শ টাকা নয় (সপ্তাহে ১৫০ টাকা করে ৪ সপ্তাহ ধরে)।

চা-শ্রমিকরা এখন যে দুটো উৎসব ভাতা পান, সেই সামান্য উৎসব ভাতাও কমানোর সুপারিশ করেছে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। মজুরি বোর্ডের উচিত এখন শ্রমিকেরা যে উৎসব ভাতা পান, তা ঠিক রাখার, নয়তো উৎসব ভাতার পরিমাণ বাড়ানো। এমনিভাবে মজুরি বোর্ড চা বিক্রির দশমিক ৩০ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় করার যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি করাও তাদের উচিত হয়নি। মজুরি বোর্ড শ্রম আইন অনুসারে মালিকদেরকে নিট মুনাফার পাঁচ শতাংশ শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয়ের প্রস্তাব করতে পারত। মালিকেরা কোনোদিনই তাদের নিট মুনাফার পাঁচ শতাংশ শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করেনি। এটাও শ্রম আইনের একটা বড় লঙ্ঘন।

শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা ইতোমধ্যে যেসব সুবিধা নিশ্চিত করেছে, ন্যূনতম মজুরি বোর্ড অকারণে সেসব গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করেছে। পক্ষান্তরে শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা পেনশন ও গ্রাচুইটির অধিকার খর্ব করার সুপারিশ করেছে।

উত্তরণের উপায় ও করণীয়

নতুন মজুরি কাঠামোর খসড়া তৈরি করে সর্বসাধারণের পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার জন্যে ১৪ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়। বেঁধে দেওয়া সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে গত ২৬ জুন। এই মজুরি কাঠামোর অন্যতম পক্ষ বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন তাদের অভিযোগ ও সুপারিশগুলো পাঠিয়েছে। সেখানে দৈনিক নগদ মজুরি ৩০০ টাকা করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একইভাবে চা বাগান কর্মচারী ইউনিয়ন (বিটিইএসএ) ন্যূনতম মাসিক বেতন ২৫৪০০ টাকা দাবি করে তাদের অভিযোগ ও সুপারিশগুলো পাঠিয়েছে। আরও বেশ কয়েকটি সংগঠন ও ব্যক্তি তাদের পর্যবেক্ষণ মতামত ও পরামর্শ পাঠিয়েছেন। ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গত ২৭ জুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করতে একটি বৈঠক ডেকেছিল। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাম ভজন কৈরি ওই সভায় যোগ দেননি। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, ‘ন্যূনতম মজুরি বোর্ড আমাদের একটি দাবিও মানেনি। আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে আমি নিশ্চিত হয়েছি যে, ন্যূনতম মজুরি বোর্ড আমাদের কোনো দাবি মানবে না।’

গত ২৭ জুনের সভায় কী হলো, তা নিয়ে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তবে, একটি সূত্র জানাচ্ছে, খসড়া মজুরি কাঠামোতে কোনোরূপ পরিবর্তন আনা হয়নি। আর তারা এই খসড়া সুপারিশ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে গত ২৮ অথবা ২৯ জুন পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ৪৫ দিনের মধ্যে তাদের সুপারিশসহ এই কাঠামোটি আবার ফেরত পাঠাতে পারেন, যদি তারা মনে করেন যে এই মজুরি যথাযথ হয়নি। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হলে এবং প্রস্তাবিত মজুরি চূড়ান্ত হলে সরকার এটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার মধ্যেই নতুন করে মজুরি বোর্ড গঠন করতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার প্রস্তাবিত মজুরি কাঠামোকে বাদ দিয়ে মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এর সংশোধন বা পরিবর্তন করতে পারে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন দর কষাকষির ক্ষেত্রে খুবই দুর্বল একটি পক্ষ। বাংলাদেশের চা-শ্রমিকেরা প্রায় সবাই অবাঙালি, নিম্নবর্ণের হিন্দু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর। মূল ধারার জনগোষ্ঠীর থেকে তারা অনেক পিছিয়ে ও বিচ্ছিন্ন। তবে, মজুরি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এখনো দ্বার উন্মুক্ত আছে। তাদের আরও সংগঠিত হতে হবে এবং সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

চা-শ্রমিকদের নিয়ে অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘চা-শ্রমিকরা চা-বাগানের গণ্ডির ভেতরে বন্দি। তাদের সামগ্রিক অবস্থা খুবই করুণ এবং তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী। চা-বাগানের উৎপাদন বাড়ুক, এটা সবাই চায়। কিন্তু, এখানে লাভ-ক্ষতির হিসাবটা এমনভাবে করা উচিত, যেন শ্রমিকেরা তাদের মালিকের সঙ্গে ন্যায্য অধিকার এবং সুবিধা নিয়ে দর কষাকষি করতে পারে।’

চা-শ্রমিকরা আসলে কতটুকু মজুরি পাচ্ছে, তা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার জন্যে ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ, প্রগতিশীল অর্থনীতিবিদ, বিলস এবং সেডের গবেষকদের এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে একটি ন্যায্য মূল্যায়ন আসতে পারে। বিশেষজ্ঞরা চা-শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও সুরক্ষার জন্যে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনার দাবি করেছেন।

মালিকেরা চা শ্রমিকদের যে মজুরি দেন বলে দাবি করেন, সেটা সম্পূর্ণ অন্যায্য ও তাদের একপেশে হিসাব। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সাংগঠনিকভাবে মালিকদের এই হিসাবকে ও তথ্য-উপাত্তকে কখনো চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। তাই চা-শ্রমিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্যে কতটুকু মজুরি যুক্তিযুক্ত, তা নির্ধারণ করতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ, প্রগতিশীল নিরপেক্ষ অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এবং সেডের গবেষকদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। চা-শ্রমিক ও কর্মচারীদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্যে একটি ন্যায্য মজুরি কাঠামো ঘোষণা দেওয়া প্রাসঙ্গিক ও সময়ের দাবি। এ ব্যাপারে আপোষের কোন সুযোগ নেই।

লেখক : শ্রম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বিঃদ্রঃ মানব সংবাদ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে