গত দশমাসে ২০০৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২০৯৭ জন নিহত

সোমবার, নভেম্বর ২১, ২০২২,১২:০১ অপরাহ্ণ
0
56

[ + ফন্ট সাইজ বড় করুন ] /[ - ফন্ট সাইজ ছোট করুন ]

প্রাণহানি বেড়েছে ১৯.২৮% 

সৈয়দ আমিরুজ্জামান, বিশেষ প্রতিনিধি : দশমাসে গত বছরের তুলনায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ২১.১৭% এবং প্রাণহানি ১৯.২৮% বেড়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ২০০৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২০৯৭ জন নিহত হয়েছে। আহত ১২৮৬ জন। নিহতদের মধ্যে ১৬.৫৪ শতাংশ (৩৪৭ জন) ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী এবং ৭৩.১০ শতাংশ (১৫৩৩ জন) ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী। দুর্ঘটনায় ৭৬৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে, অর্থাৎ ৩৬.৪৩ শতাংশ। মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ৯২ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ৪.৩৮ শতাংশ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

দুর্ঘটনার ধরন:

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহের মধ্যে অন্য যানবাহনের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ৩৭৪টি (১৮.৬৭%), মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬২৯টি (৩১.৪০%), মোটরসাইকেলে অন্য যানবাহনের চাপা ও ধাক্কা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে ৯৫৮টি (৪৭.৮২%) এবং অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪২টি (২.০৯%)।

দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও পথচারী:

দুর্ঘটনাসমূহ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৮৩৭টি (৪১.৭৮%) দুর্ঘটনার জন্য মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী। বাস চালক দায়ী ৮.৪৩% (১৬৯টি দুর্ঘটনা), ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি চালক দায়ী ৩৭.০৪% (৭৪২টি দুর্ঘটনা), প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস চালক দায়ী ২.৭৯% (৫৬টি দুর্ঘটনা), থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-অটোরিকশা-অটোভ্যান-নসিমন-ভটভটি-টমটম) চালক দায়ী ৫.৯৪% (১১৯টি দুর্ঘটনা), প্যাডেল রিকশা ও বাই-সাইকেল চালক দায়ী ০.৮৪% (১৭টি দুর্ঘটনা) এবং পথচারী দায়ী ৩.১৪% (৬৩টি দুর্ঘটনা।

দুর্ঘটনা সংঘটিত সড়কের ধরন:

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৬৯৫টি (৩৪.৬৯%) জাতীয় মহাসড়কে, ৮৭৯টি (৪৩.৮৮%) আঞ্চলিক সড়কে, ৩২৯টি (১৬.৪২%) গ্রামীণ সড়কে এবং ১০২টি (৫.০৯%) শহরের সড়কে সংঘটিত হয়েছে।

দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনসমূহের সংখ্যা:

দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ৩,৫৬১টি। মোটরসাইকেল ২,১৩৩টি, বাস ২১৪টি, ট্রাক- কাভার্ডভ্যান-পিকআপ ৭৫৬টি, ড্রামট্রাক-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি ইত্যাদি ১২৯টি, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার ১০৩টি, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-অটোরিকশা-অটোভ্যান-নসিমন-ভটভটি-টমটম) ২০৭টি এবং প্যাডেল রিকশা ও বাই-সাইকেল ১৯টি।

দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণ:

সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৩.১৪%, সকালে ২৬.৮০%, দুপুরে ১৬.৩৭%, বিকালে ১৯.৬৭%, সন্ধ্যায় ১০.৬৩% এবং রাতে ২৩.৩৬%।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কারণসমূহ:

১. কিশোর-যুবকদের বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানো;                     

২. অতি উচ্চগতির মোটরসাইকেল ক্রয়ে সহজলভ্যতা ও চালনায় বাধাহীন সংস্কৃতি; 

৩. মোটরযান চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; 

৪. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা;

৫. সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির শিথিলতা; 

৬. বাস-ট্রাক-পিকআপ-প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস-সহ দ্রুতগতির যানবাহনের বেপরোয়া গতি; 

৭. চালকদের অদক্ষতা ও অস্থিরতা; 

৮. ইজিবাইক-সিএনজি-নসিমন-ভটভটি ইত্যাদি স্বল্পগতির যানবাহন অদক্ষ হাতে চালানো;

৯. সড়ক-মহাসড়কে ডিভাইডার না থাকা; 

১০.কিশোর-যুবকদের গতির প্রতি আকৃষ্ট করতে মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের উত্তেজনাকর ভাষা-ভঙ্গি; 

১১. সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা না থাকা; 

১২. পারিবারিকভাবে সন্তানদের বেপরোয়া আচরণকে প্রশ্রয় দেয়া; 

১৩. দেশে কলুষিত রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় কিশোর-যুবকদের মধ্যে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর সংস্কৃতি গড়ে ওঠা ইত্যাদি।

সুপারিশসমূহ:

১. কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে;

২. মাত্রাতিরিক্ত গতিসম্পন্ন মোটরসাইকেল বিক্রয় ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে;

৩. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে; 

৪. গণপরিবহন চালকদের বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করতে হবে;

৫. বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে;

৬. ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; 

৭. মোটরসাইকেল ও স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ করতে হবে; 

৮. পর্যায়ক্রমে সকল মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে; 

৯. যানবাহনের গতি মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে; 

১০. গণপরিবহন উন্নত ও সহজলভ্য করে মোটরসাইকেল নিরুৎসাহিত করতে হবে; 

১১. রেল ও নৌ-পথ সংস্কার এবং বিস্তৃত করে সড়ক পথের উপর থেকে ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের মতো পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ কমাতে হবে; 

১২. সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে;

১৩. “সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮” সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

মন্তব্য:

গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ১৬৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৫৮ জন নিহত হয়েছিল। এই হিসাবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে দুর্ঘটনা বেড়েছে ২১.১৭% এবং প্রাণহানি বেড়েছে ১৯.২৮%।

দেশে ক্রমবর্ধমান মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ ঘটছে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ বাস ইত্যাদি ভারী যানবাহনের ধাক্কা, চাপা ও মুখোমুখি সংঘর্ষে। অপরপক্ষে, মোটরসাইকেল চালকদের অধিকাংশই কিশোর-যুবক। এরা চরম বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালিয়ে নিজেরা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং অন্যদের আক্রান্ত করছে। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত মোটরযানের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। শুধু রাজধানীতেই চলছে ১৫ লাখের বেশি। মানসম্মত গণপরিবহনের অভাব এবং যানজটের কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। মোটরসাইকেল ৪ চাকার যানবাহনের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত ও সহজলভ্য করে মোটরসাইকেলের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে হবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ তা-ই করছে। গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত না করে বিভিন্ন প্রকার সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মোটরসাইকেল বাণিজ্য’কে উৎসাহিত করা একটি আত্মঘাতি ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত। বছরে ৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের জন্য ১০/১২ হাজার কোটি টাকার অমূল্য জীবন-সম্পদ হারানোর কোনো মানে নেই। তাই সরকারের উচিত, এখনই মোটরসাইকেল বিপণন ও ব্যবহারের লাগাম টেনে একটি টেকসই জনবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

প্রতিবেদকের প্রতিক্রিয়া ও সুপারিশ :

এ বিষয়ে একটি টেকসই জনবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার অাহবান জানিয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, সাপ্তাহিক নতুন কথা’র বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার এই চিত্র বাংলাদেশের সড়কে নিরাপত্তাহীনতা ও সীমাহীন অব্যবস্থার চিত্রই প্রকাশ পেয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গাড়ি চালনার প্রাথমিক শিক্ষা কোর্স (ব্যবহারিক সহ) চালু করাসহ দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করা, বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা, পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্ব রাস্তা (সার্ভিস রোড) তৈরি করা, সকল সড়ক-মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করা, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার করা, রেল ও নৌ-পথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়ক পথের উপর চাপ কমানো, গণপরিবহন উন্নত, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করে মোটরসাইকেল ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা, সড়ক, নৌ ও রেলপথে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করাসহ

সড়ক পরিবহন আইন ও বিধিমালা যথাযথ বাস্তবায়নে নতুন নতুন কৌশল ও ডিজিটালাইজড উদ্ভাবনকে কাজে লাগাতে হবে। সর্বোপরি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও ডিজিটাইজড করতে হবে। এ বিষয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে প্রায় দুই বছর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন প্রজেক্ট পাঠানো হয়েছে, তা বাস্তবায়ন জরুরি।

জনসাধারণ ও পথচারীদের ব্যক্তি নিরাপত্তা ও বিধি-বিধান প্রতিপালনে সচেতন হতে হবে। নাগরিকদের মধ্যে আইন ও শৃঙ্খলা মানার সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে হবে। সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা, শ্রমিক নেতা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যথাযথ আইন প্রয়োগে সহায়তা প্রদান করতে হবে।

প্রশাসন, পুলিশ, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ, মালিক, চালক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জাতীয়ভাবে সেল তৈরি করে এবং প্রতি বিভাগ ও জেলায় একইভাবে সেল গঠন করে নিয়মিত মনিটরিং ও পরামর্শ প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং এ সেলকে সর্বদাই সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করা সম্ভব।”

বিঃদ্রঃ মানব সংবাদ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে