করোনা মোকাবিলায় ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর বৈঠক

শনিবার, এপ্রিল ৪, ২০২০,৮:১৫ পূর্বাহ্ণ
0
64

[ + ফন্ট সাইজ বড় করুন ] /[ - ফন্ট সাইজ ছোট করুন ]

সারা বিশ্ব আজ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। বাংলাদেশ তার বাইরে নয়। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে বাংলাদেশে গত ২৬ মার্চ থেকে কার্যতঃ লকডাউন চলছে। এর ফলে দেশের শ্রমজীবি-কর্মজীবি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যারা ‘দিনআনে দিনখায়’ অবস্থায় তারা বিশেষ সংকটে। সরকার রপ্তানীমুখী শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেয়ায় জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছে। স্বস্তির কথা যে এই বেতন-ভাতা সরাসরি শ্রমিক-কর্মচারীদের ব্যাংক একাউন্টে অথবা মোবাইল ব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান করা হবে। তেমনি শহর ও গ্রামের দরিদ্রদের জন্য ১০ টাকা কেজি দরে চাল, ভিজিডি, ভিজিএফ কর্মসূচী সম্প্রসারণকরণ, ‘ঘরে ফেরা কর্মসূচীতে’ শহর থেকে যারা গ্রামে ফিরে যাবে তাদের সহয়তা, এমনকি ভাসানচরে আবাসান দেয়ার কথাও বলা হয়েছে। এর প্রতিটি সৎ উদ্দেশ্য প্রণোাদিত। তবে এসবই বাস্তবায়ন হচ্ছে সরকারি প্রশাসন আমলা পুলিশ দ্বারা। রাজনৈতিক দল সামাজিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধিদের এক্ষেত্রে কোন ভূমিকাই নাই। এমনকি ক্ষমতাসীন দলেও সেভাবে নাই। একথা সবার জানা যে কিভাবে এ ধরনের বিতরণ ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্থ। তাছাড়া সরকারের পক্ষে একা মোকাবেলা করা সম্ভব না। সেক্ষেত্রে সমগ্র জাতিকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সমবেত (mobilize) করা ও ঐক্যবদ্ধ করার জরুরি কাজটি এখনও অনুপস্থিত। প্রধানমন্ত্রী বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে বলেছেন। আর তারা প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে টাকা দিয়ে দায়িত্ব সারছেন। বিভিন্ন সমাজহিতৈষী প্রতিষ্ঠান সংকটাপন্ন মানুষের খাদ্য, ঔষধ সাহায্যে এগিয়ে এলেও তাদের ক্ষমতাও সীমাবদ্ধ।

এদিকে দেশের ৮৭% শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। তারা বিশেষ করে শহর থেকে টাকা পাঠিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচলই রাখে না, বরং জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও ভূমিকা পালন করে।
করনো ভাইরাস পরবর্তী অর্থনীতির অবস্থা কিরূপ নেবে তা এখনই অনুমান করা যায়। ইতিমধ্যে পোষাক শিল্পের কোটি কোটি টাকার ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে। ঔষধ বাদে অন্যান্য রপ্তানীও সহসা উন্নতি হবে না। প্রবাসী আয়, যার উপর রিজার্ভ দাড়িয়ে আছে, তা বিশেষভাবে কমে যাবে। অনেক প্রবাসী শ্রমিককে দেশে ফিরে আসতে হবে। ফলে দেশের জাতীয় আয় যেমন কমে যাবে, তেমনি বেকারের এই দেশে কর্মসংস্থানের উপর বিশেষ চাপ পড়বে। এ পর্যন্ত বিশ্ব মন্দায় দায় বাংলাদেশ এড়াতে পারলেও এবার পারবে না।

ভবিষ্যতে কোনো প্রকার খাদ্যাভাব মেটাতে সরকার কৃষির ফসলের উপর নির্ভর করছে। প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি ইঞ্চি জমি আবাদ করতে বলছে। কিন্তু ধানের দাম নিয়ে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় কৃষকরা ধান ফলাতে তত উৎসাহ বোধ করছেনা, তাছাড়া এবার তাদের পুঁজির অভাবও প্রকট হয়ে দেখা দেবে। করোনার প্রভাবে পোল্ট্রি ও দুধ খামারীরা বিশেষ সংকটে।
করোনা ভাইরাস স্বাস্থ্য বিষয়ক হলেও এর প্রতিরোধে পুরো সরকারকেই নিয়োজিত করার ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা জোর দিয়েছিল। সেখানে করোনা সংক্রমণ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্তসারশূন্যতা প্রকট করে দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে নেতৃত্ব শূন্যতা, অব্যবস্থাপনা, গোষ্ঠী স্বার্থপরতা সব মিলিয়ে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধের কার্যক্রমকে স্থবির করে রেখেছে।

বহু চিৎকারের পর ঢাকা ও ঢাকার বাইরে আরও পরীক্ষাগারকে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষার অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে অনেকেই এখনই প্রস্তুত না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে সংখ্যাতত্বই দিন হাসপাতাল গুলোও সেভাবে প্রস্তুত না। ফলে করোনা উপসর্গ নিয়ে যে মৃত্যু হচ্ছে তা হিসাব আসছে না। উপসর্গ নিয়ে সরকারি বেসরকারী হাসপাতাল রোগী ভর্তি করছে না। চিকিৎসকগণ সাধারণ রোগের চিকিৎসা করতে অপরারগতা প্রকাশ করছে। ডাক্তারও স্বাস্থ্য কর্মীদের সুরক্ষা পরিধান (পিপিই) প্রয়োজন অনুসারে সরবরাহ না করায় তারা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ে চিন্তিত এবং তার থেকে চিকিৎসা দিতে অনাগ্রহ কেবল নয়, এমনকি চিকিৎসা না দিতে কর্মবিরতিও পালন করেছে কোথাও কোথাও। এটা সারা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকটেরই পরিচায়ক। এ অবস্থায় করোনা সংক্রমণের আরো বিস্তৃতি ঘটলে কি অবস্থা হবে সেটা অনুমেয়।
করনো ভাইরাস যখন জীবন মরণ সমস্যা তখন দেশের পরিচিত ধর্মবাদীরা ইউটিডব, ফেসবুকে যথেচ্ছ মিথ্যা প্রচার করে চলেছে। সরকার গুজবের বিরুদ্ধে কঠোর হলেও তাদের এই হীনকার্যক্রম নির্বিঘ্নে চলতে দিচ্ছে।

এই অবস্থায় ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো মনে করেঃ-

১। পরিপূর্ণ জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে করনো ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে জনগণকে উদ্ধুদ্ব করতে হবে ও নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে।
২। এক্ষেত্রে ঐ প্রতিরোধ লড়াইয়ের মূল সংগঠন স্বাস্থ্যসেবা আমলাদের হাত থেকে নিয়ে পেশাদার রোগতত্ববিদ, ভাইরোলজিস্ট, মাইক্রো বায়োলজিস্ট, ঐ প্রতিরোধের ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা চিকিৎসকদের সমন্বিত নেতৃত্বে পরিচালিত করতে হবে।
৩। চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী, সহায়তাকর্মীবৃন্দের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে এবং পিপিইর যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের করনো বীমার ব্যবস্থা করতে হবে।
৪। রপ্তানী শিল্পশ্রমিক-কর্মচারীদের মত অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমজীবি-কর্মজীবি, গ্রামীণ শ্রমজীবি নারী-পুরুষের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন ও তা বিতরণের জন্য কেন্দ্র থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত স্থানীয় প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, শ্রমিক-কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটি দ্বারা পরিচালনা করতে হবে।
৫। শিল্পকারখানা, অফিস আদালতে কর্মী ছাটাই এক বছরের জন্য পরিপূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে।
৬। শিল্প বাণিজ্যিক উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দিতে হবে।
৭। কৃষকের ধান ও অন্য পণ্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে, প্রয়োজনে সরকার তা কিনে নেবে এবং গুদাম না থাকলে কৃষকের কাছেই মজুত রাখতে হবে। তাদের চাষের উপকরণের মূল্য হ্রাস করতে হবে এবং সমবায় ভিত্তিতে চাষাবাদকে উৎসাহিত করতে হবে।
৮। যুবকদের কর্মসংস্থান, অন্যথায় বেকার ভাতা, ষ্টার্ট আপক্যাপিটেলের শর্ত সহজ করা ও তার অংকের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে।
৯। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমসমূহকে স্বাধীন স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশের নিশ্চয়তা বিধান এবং বিশেষ করে এক্ষেত্রে আইসিটি আইনে বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল করতে হবে।

ওয়ার্কার্স পার্টি আশা করে এ ধরনের দুর্যোগ অবস্থায় অতীতের মত জাতীয় জাগরণ সৃষ্টি করে করনো ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ ও তার পরবর্তীতে অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা সম্ভব। বাংলাদেশের জনগণ অতীতে এর প্রমাণ দিয়েছে, বর্তমানেও দেবে।

পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা হোয়াটাস অ্যাপের মাধ্যমে সঞ্চালন করেন পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফজলে হোসেন বাদশা এমপি। যুক্ত হন পলিটব্যুরোর সদস্যবৃন্দ কমরেড আনিসুর রহমান মল্লিক, কমরেড ড. সুশান্ত দাস, কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক, কমরেড নুর আহমদ বকুল, কমরেড হাজেরা সুলতানা, কমরেড কামরূল আহসান, কমরেড আমিনুল ইসলাম গোলাপ, কমরেড মোস্তফা লুৎফুল্লাহ এমপি, কমরেড জ্যোতি শংকর ঝন্টু, কমরেড অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী, কমরেড হাজী বশির ও কমরেড অধ্যাপক নজরুল হক নীলু।

বিঃদ্রঃ মানব সংবাদ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে