একুশের তাৎপর্য ছড়িয়ে দিতে হবে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২০,৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
0
27

[ + ফন্ট সাইজ বড় করুন ] /[ - ফন্ট সাইজ ছোট করুন ]

বছর ঘুরে প্রতিবার চলে আসে আমাদের সেই ২১ শে ফেব্রুয়ারী, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত ও পরিচিত এই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনের অনেক হারানো আর অনেক পাওয়ার এক সমৃদ্ধিময় দিন, যা কিনা কখনো ভোলার নয়।

 ২১ শে ফেব্রুয়ারী আমাদের জাতীয় সত্তার প্রাণ স্পন্দনের নাম। বছরের ব্যবধান পেরিয়ে, কালের আবর্তে ঘুরে ঘুরে আবার এ দিনটি এসেছে অশ্রুসজল স্মৃতির মালা বহন করে। চারিদিকে বিভিন্ন ভাবে সাড়া পড়ে গেছে একে বরণ করার প্রচেষ্টায়। প্রকৃতি নিজেক সাজিয়ে তুলেছে বিভিন্ন রকম রং ও গন্ধের ফুলের সমারোহে, যেগুলো কিনা আশ্রয় পাবে শহীদ মিনারের পাদদেশে। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের উদ্দেশ্যে পুষ্পান্জলীর মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় সমস্ত বাঙ্গালী জাতি। রক্তীম কৃষ্ণচূড়াও ছড়িয়ে দেয় তার আগুন ঝরা রুপ চারিদিকে ।

ফেব্রুয়ারী বা ফাল্গুন মাস এলেই চারিদিকে কেমন উৎসব উৎসব ভাব শুরু হয়ে যায়। বাংলা একাডেমীর বিশাল প্রাঙ্গন তৎপর হয়ে ওঠে নানান রকম কার্যকলাপে যেমন বই মেলা, গান-বাজনা, কবিতা পাঠ, বক্তৃতা ইত্যাদি। বড় বড় গাছপালা গুলির শাখা-প্রশাখা ভরে যায় অ-আ-ক-খ-তে আর রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসে চমৎকার সব গণসংগীত আর কবিতা পাঠের আসর। হঠাৎ করেই যেন দেশীয় পোশাকের কদর বেড়ে যায়, সুতীর শাড়ি বিশেষ করে কালো পাড়ের সাদা শাড়ি, পাজামা-পান্জাবী পড়ে বিভিন্ন বয়সী পুরুষ ও মহিলারা ভীড় জমায় শহীদ মিনারে। বাহান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারীর এই দিনটিতে মাতৃভাষার সম্মান বাঁচাতে সালাম-বরকতেরা যে আত্মাহুতি দিয়েছিল তা বৃথা যায়নি। এসব তরুণদের তাজা রক্তে ভরে গিয়েছিল বাংলার মাটি।

তাঁদের অসীম সাহস, শক্তি আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ নিয়ে যে লড়াই সেটাই পরবর্তিতে এনে দিয়েছে স্বাধীনতা, ভাষার স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা আনতে গিয়ে হাড়িয়েছি আমরা অনেক গুলি প্রাণ আর তাই এই একুশ একদিকে যেমন এনে দেয় প্রাপ্তির আনন্দ আবার অন্যদিকে হারানোর কষ্টে মনকে করে দেয় ভারাক্রান্ত। আর তাই এই দিনে দলে দলে মানুষেরা শহীদ মিনারের চত্বরে জমা হয়ে ফুল দিয়ে জানায় তাদের মনের অপরিসীম শ্রদ্ধা। কোন বাঁধাই আটকাতে পারেনা জনগণকে, কুয়াশার কান্নাঝরা শীতের সকালে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ নিয়ে নতুন শপথের অঙ্গীকার নিয়ে মন বলে ওঠে, “আমরা তোমাদের ভুলবোনা, ভুলবোনা……..

কিন্তু একুশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কি শুধুই ফুল দিয়ে আর গানের মাঝ দিয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে ? না, কখনোই না, এই দিনটিকে শুধু এই তারিখের মাঝে না, বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাদের সবার দৈনন্দিন জীবনের মাঝে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের কর্মকান্ডের মাঝে একুশের আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। পাশাপাশি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে একুশের তাৎপর্যকে ছড়িয়ে দিতে হবে। শিশুদেরকে ছোটকাল থেকেই দিনটির পরিপূর্ণ মর্যাদা সম্পর্কে জানাতে হবে, বোঝাতে হবে ২১’র গুরুত্ব।

বাঙ্গালীর চেতনার মাঝে একুশে ফেব্রুয়ারী যে পরশমনি হয়ে বেঁচে আছে সেই পরশমনির ছোঁয়ায় সমস্ত বাঙ্গালীর হৃদয়কে জাগিয়ে তুলে যার যার নিজ সত্তা সম্পর্কে বুঝিয়ে দিতে হবে। আমাদের ভাষার স্বকীয়তা যেন আমাদের ভাষা, সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে আমাদের সামগ্রিক পরিচয় বহন করে। বিশ্ববাসী যেন বুঝতে পারে বাংলা ভাষার গুরুত্ব, সৌন্দর্য আর দিতে পারে এর যথাযথ মর্যাদা। বাঙ্গালী হিসাবে আজ আমরা এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিকারী, আমাদের নিজস্ব ভাষা আছে, সংস্কৃতি আছে। এই ভাষা ও সংস্কৃতির সুষ্ঠু ব্যবহার এর যথাযথ মূল্যায়ন ও সার্থক প্রয়োগের মাঝেই আমাদের স্বকীয়তার সাফল্য নিহিত রয়েছে।

আমাদের সবার প্রার্থনা ও অঙ্গীকার হোক, মাতৃভাষা আর মাতৃভূমিকে ভালবেসে আমরা যেন আমাদের আগামী দিন গুলিকে আরো সমৃদ্ধশালী করে তুলতে পারি। নিজেরদের ছোট ছোট স্বার্থকে গুরুত্ব না দিয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধীকার দিয়ে সবার ওপরে তার স্থান দিতে পারি, দেশের সবরকম কল্যাণকর কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে দেশ যাতে সামনে এগিয়ে যেতে পারে সেদিকে সচেষ্ট হতে পারি।। ২১ শে ফেব্রুয়ারী আমাদের জাতীয় চেতনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের দিন, আত্মশুদ্ধিতে উদ্বুব্ধ হবার দিন, তাই প্রতিটি বছরেরে এই ফাল্গুনের রাঙা ভোরে একুশের আগমন আমাদের সকল চাওয়া ও সাধনাকে নতুন করে যাচাই করার সুযোগ পাক।

শুধু বড় বড় নৈতিকতার বানী শুনিয়ে আর মিথ্যা আশ্বাসের মালা না গেঁথে সত্যিকারের দরদি মন নিয়ে আমাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু ফুল, মালা আর গানের মাঝ দিয়েই নয়, বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের সবাইকে আরো অনেক বেশী চেস্টা চালিয়ে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, একুশের আত্মদান সেই দিনই সার্থক হবে যেদিন আমরা এই আত্মত্যাগের যথার্থতা মন দিয়ে উপলব্ধি করে একে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবে রুপ দিতে পারব।

‘মোদের গরব মোদের আশা, আমরি বাংলা ভাষা।’ এ বাংলাভাষাকে শ্রদ্ধা করুন।

লেখক : মোঃ মনির হোসেন

বিঃদ্রঃ মানব সংবাদ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে