আমার মা ছিলেন সবচেয়ে বড় গেরিলা : প্রধানমন্ত্রী

রবিবার, আগস্ট ৮, ২০২১,৯:০১ অপরাহ্ণ
0
5

[ + ফন্ট সাইজ বড় করুন ] /[ - ফন্ট সাইজ ছোট করুন ]

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এই যে একটা গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু আমি সব সময় এটা বলি, আমার মা ছিলেন সবচেয়ে বড় গেরিলা এবং অসম্ভব স্মরণশক্তি ছিল বঙ্গমাতার। আর বাংলাদেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত সঠিক সময়ে আমার মা নিয়েছিলেন বলেই কিন্তু আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছি।’

রোববার তিনি এসব কথা বলেন, ‘বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিবের ৯১তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন’ ও ‘বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিব পদক-২০২১ প্রদান’ অনুষ্ঠানে। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে। এবারই প্রথম জাতীয়ভাবে পালিত হয় বঙ্গমাতার জন্মদিনটি। এই মহীয়সী নারীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানিয়ে বঙ্গমাতা পদকে ভূষিত করা হয় দেশের জন্য বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পাঁচজন নারী ব্যক্তিত্বকে। এ ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম। অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেছা ইন্দিরার সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য দেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব সায়েদুল ইসলাম। এছাড়া পুরস্কারপ্রাপ্তদের জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে অনুষ্ঠানে পদক বিজয়ীদের হাতে ‘বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিব পদক-২০২১’ তুলে দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গমাতা অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। কখনো রাজনৈতিক নেতা হতে হবে, রাজনীতি করে কিছু পেতে হবে, সেই চিন্তা কখনো তাঁর ছিল না। কোনো সম্পদের প্রতিও তার কোনো আগ্রহ ছিল না। এভাবেই নিজের জীবনকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন। জাতির পিতার পাশে থেকে সব সময় প্রেরণা জুগিয়েছেন আমার মা। এটাই সব থেকে বড় ত্যাগ স্বীকার বলে আমি মনে করি।’ 

‘যে জাতির মুক্তির জন্য নিজের জীবনের সব সুখ, শান্তি বিলিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা এনে দিলেন, তাকে সেই বাঙালিই কোন অপরাধে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করল? কেন এই হত্যাকাণ্ড? কী অপরাধ ছিল আমার বাবার, আমার মায়ের, আমার ভাইদের? একটা জাতির স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য যারা নিজের জীবনটাকে উৎসর্গ করলেন, সমস্ত জীবনের সুখ, শান্তি সবকিছু বিলিয়ে দিলেন তাদেরকে সেই বাঙালিই খুন করল ! কেন?’ 

শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘মানুষ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ায় তখন তার মনে সব থেকে আগে আসে নিজের জীবনটা বাঁচানো এবং নিজের জীবন ভিক্ষা চাওয়া। কিন্তু আমার মা (বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিব) খুনিদের কাছে নিজের জীবন ভিক্ষা চান নাই। তিনি নিজের জীবন দিয়ে গেছেন। আমার আব্বাকে (বঙ্গবন্ধু) হত্যার পর, তখনই তিনি (বঙ্গমাতা) খুনিদের বললেন, তোমরা উনাকে (বঙ্গবন্ধু) মেরেছ, আমাকেও মেরে ফেল। তিনি আরও বলেন, ওই সময় খুনিরা আমার মাকে (বঙ্গমাতা) বলেছিল আমাদের সঙ্গে চলেন। তখন খুনিদের মা সাফ বলে দেন- তোমাদের সঙ্গে আমি যাব না, তোমরা এখানেই আমাকে খুন কর। ঘাতকের বন্দুক গর্জে উঠেছিল, সেখানেই আমার মাকে তারা নির্মমভাবে হত্যা করে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কতটা সাহস একটা মানুষের মনে থাকলে সে মানুষটা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবন ভিক্ষা না নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারেন। আজকে আমাদের দেশের নারী সমাজ যে একটা জায়গা খুঁজে পেয়েছে, সেখানে আমি মনে করি আমার মায়ের এই কাহিনি শুনলে অনেকেই অনুপ্রেরণা পাবেন। শক্তি ও সাহস পাবে দেশের জন্য, জাতির মঙ্গলের জন্য কাজ করতে। শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গমাতা একদিকে সংসার সামলেছেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো যেন সঠিক সময়ে সঠিকভাবে নেওয়া যায় তার ব্যবস্থাও করেছেন। প্রত্যেকটা আন্দোলন-সংগ্রামে বঙ্গমাতার অবদান রয়েছে।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘বঙ্গমাতা গোপনে ও ছদ্মবেশে দলের লোকজনের সঙ্গে দেখা করা, ছাত্রলীগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং তাদেরকে নির্দেশনাও দিতেন। একটা বোরকা পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লেক, বিশেষ করে পলাশীর মোড়ে বা আজিমপুর কলোনিতে আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করতেন। তাদেরকে দিকনির্দেশনা দিয়ে আবার ফিরে এসে তিনি আমাদেরকে নিয়ে বাসায় ফিরতেন।’ এসব বিস্তারিত নিজের বিভিন্ন লেখায় রয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই যে একটা গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু আমি সব সময় এটা বলি, আমার মা ছিলেন সবচেয়ে বড় গেরিলা এবং অসম্ভব স্মরণশক্তি ছিল বঙ্গমাতার। আর বাংলাদেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত সঠিক সময়ে আমার মা নিয়েছিলেন বলেই কিন্তু আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছি।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকও হয়েছে। ছয় দফা ছেড়ে অনেক নেতা চলেও গেছেন। মা তখন খুব শক্ত ছিলেন ছয় দফার পক্ষে।’ ৬ দফা আন্দোলনেও বঙ্গমাতা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে তিনি (বঙ্গমাতা) যে কতটা সচেতন ছিলেন সেটা বড় মেয়ে হিসাবে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। ৬ দফা না ৮ দফা, এটা নিয়ে ওই সময় নেতারা নানা কথা বলতেন। কিন্তু সেই সময় ৬ দফা থেকে একচুল, দাড়ি-কমাও এদিক-ওদিক যাবেন না, এটাই ছিল বঙ্গমাতার সিদ্ধান্ত। মা বুঝেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ৬ দফার একটি দাড়ি, কমাও বদলাবে না। আর সেটাই আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে পাস হয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘জাতির পিতার সহচর হিসাবে বঙ্গমাতা এক হাতে যেমন সংসার সামলেছেন, তেমনি অনেক সময়োচিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগিতা করেছেন। তিনি তার পুরো জীবনটাকে উৎসর্গ করেন আমার বাবা যে আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করেছেন, সেই আদর্শের কাছে।’

অনুষ্ঠানে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া, সমাজসেবা, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ, গবেষণা, কৃষি ও পল্লী উন্নয়নে পাঁচজন বাংলাদেশি নারীকে পদক দেওয়া হয় গুরুত্বপূর্ণ অবদান ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার জন্য। প্রথমবারের মতো অন্তর্ভুক্ত ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব’ পদকটি এবার থেকে নারীদের জন্য ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক হিসাবে গণ্য হবে।

১৮ ক্যারেট স্বর্ণের ৪০ গ্রাম ওজনের একটি পদক, ৪ লাখ টাকার চেক, সার্টিফিকেট এবং উত্তরীয় প্রদান করা হয় পুরস্কার হিসাবে। পুরস্কার বিজয়ীরা হচ্ছেন-বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মমতাজ বেগম (মরণোত্তর), জয়াপতি (মরণোত্তর), মোসাম্মাৎ নুরুন্নাহার বেগম, বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ জোবেদা খাতুন পারুল এবং নাদিরা জাহান (সুরমা জাহিদ)।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য যারা ‘বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিব পদক-২০১’ পেয়েছেন তাদের সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গমাতার জন্মবার্ষিকী এ বছরই প্রথমবারের মতো জাতীয় দিবস হিসাবে উদযাপন এবং ‘বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিব পদক’ প্রদান করা হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য-‘বঙ্গমাতা, সংকটে-সংগ্রামে নির্ভীক সহযাত্রী’ যথার্থ হয়েছে উল্লেখ করে করেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইতিহাসবিদ বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।

বিঃদ্রঃ মানব সংবাদ সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে